


উজির আলি, চাঁচল: খাজনা দিতে না পারায় নবাবের কঠিন শাস্তি পোহাতে হয় খাজাঞ্চিকে। আধমরা অবস্থায় বাক্সবন্দি করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পরে সাধুদের হাতে প্রাণ ফিরে পায়। তারপরেই স্বপ্নাদেশে শুরু দেবী দুর্গার আরাধনা। এভাবেই নবাব আমলের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে চাঁচলের কলিগ্রাম রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজোয়। প্রায় আড়াই শতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই পুজো আজও নিষ্ঠা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে হয়ে আসছে ওই পরিবারে। মহালয়ার পরের দিন রবিবার প্রতিপদ থেকেই রায়চৌধুরী বাড়িতে শুরু হয়েছে পুজোর আচার। কথিত আছে, তৎকালীন নবাব আলিবর্দি খাঁয়ের খাজাঞ্চি ছিলেন কলিগ্রামের বদররাম রায়চৌধুরী। সেসময় এলাকায় ভয়াবহ খরা দেখা দেয়। খরার কারণে কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা সম্ভব হয়নি। ফলে নবাবের দরবারে নির্দিষ্ট সময়ে খাজনা পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হন বদররাম। তার জেরেই তাঁকে কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হয়।
শাস্তিস্বরূপ আধমরা অবস্থায় তাঁকে একটি বাক্সে বন্দি করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি তাঁর জীবন। নদীতীরে তাঁর গোঙানির শব্দ শুনতে পেয়ে কয়েকজন সাধু তাঁকে উদ্ধার করেন। তাঁদের সেবাশুশ্রুষায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন বদররাম।
সাধুদের প্রচেষ্টায় প্রাণ ফিরে পেলেও তাঁর মনে বিশ্বাস জন্মায় যে, দেবী দুর্গার কৃপায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। এরপর স্বপ্নাদেশ পেয়ে নিজের বাড়িতে একচালা ছাউনির নীচে দেবী দুর্গার পুজো শুরু করেন তিনি। সেই থেকেই কলিগ্রামের রায়চৌধুরী বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন। পরবর্তীতে বদররামকে জীবিত দেখে বিস্মিত হন নবাব আলিবর্দি খাঁ। খুশি হয়ে নবাব তাঁকে চাঁচলের ভান্ডারিয়া, মালচা ও গালিমপুর সহ মোট পাঁচটি পরগনা উপহার দেন। পরিবারের উত্তরসূরী সৌমেন রায়চৌধুরী বলেন, সাতপুরুষ ধরে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। করিবর্গা দিয়ে তৈরি মন্দিরে পুজো হত। পরে সেই মন্দির ভেঙে তৈরি হয়েছে নতুন দালান। দেবীমায়ের জমিতে উৎপন্ন ফসল বিক্রির টাকা ও পরিবারের নিজস্ব খরচেই পুজোর আয়োজন করা হয়। জানা গিয়েছে, আগে বলি দেওয়ার রীতি ছিল। তার পরিবর্তে এখন দশমীতে দেবীকে মোহনভোগ নিবেদনের রীতি চালু হয়েছে। পুজোর বিশেষ আকর্ষণ দেবী দুর্গার ডাকের সাজ।
পাশাপাশি পুজোয় দেবীর বাহন সাদা রঙের সিংহকে অসুররূপে চিত্রিত করা হয় এখানে। এই বৈশিষ্ট্যই রায়চৌধুরী পরিবারের পুজোকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি দেয়। নবমীতে হয় কুমারীপুজো। প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত পুজোর বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন পরিবারের গৃহবধূরা। দশমীর গোধূলিলগ্নে দেবীকে বিদায় জানানোর আগে চলে সিঁদুরখেলা। গ্রামের রাণীদিঘিতে নিরঞ্জন করা হয় প্রতিবছর।