


শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: বাঁশ ও বেত, গ্রামবাংলার পরিচিত এই দুই উপকরণ একসময় মানুষের রোজকার জীবনের অংশ ছিল। ঘরবাড়ি তৈরি থেকে শুরু করে আসবাব, ঝুড়ি কিংবা নানা গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরিতে বাঁশ ও বেতের ব্যবহার ছিল। সময়ের সঙ্গে এই পরিচিত জিনিসটির ব্যহহার কমেছে। এবার হয়ে উঠছে শিল্পের মাধ্যম। তারই নিদর্শন দেখা যাবে নবপল্লি সর্বজনীন শ্যামাপুজোয়।
নবপল্লি অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালনায় ৪৭তম বর্ষে পা দিল পুজো। বাঁশ ও বেতের কারুকাজে রাজপ্রাসাদের আদলে হচ্ছে মণ্ডপ। থিমের মূল ভাবনা, পরিবেশবান্ধব শিল্প। মণ্ডপ নির্মাণে ব্যবহার হচ্ছে অসমের রঙিন বাঁশ। পাশাপাশি থাকছে ত্রিপুরার বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ ও বেত। উপকরণগুলির নিজস্ব রং, গঠন ও বুননশৈলীকে কাজে লাগানো হচ্ছে। বাঁশের স্বাভাবিক দৃঢ়তা এবং বেতের নমনীয়তা এই নির্মাণে নিচ্ছে বিশেষ ভূমিকা। বাঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে মণ্ডপের কাঠামো। অন্যদিকে বেতের নমনীয়তাকে কাজে লাগিয়ে তোলা হচ্ছে সূক্ষ্ম নকশা ও জালের মতো বুনন। এই উপকরণ বেছে নেওয়ার মধ্যে রয়েছে বিশেষ ভাবনা। বাঁশ দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রাকৃতিক সম্পদ। বেতও প্রকৃতিনির্ভর উপকরণ। সঠিকভাবে সংগ্রহ ও ব্যবহার করলে এগুলি কৃত্রিম নির্মাণসামগ্রীর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে প্লাস্টিক ও অন্যান্য কৃত্রিম উপকরণের উপর নির্ভরতা কমানোর বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাঁশ-বেতের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই উদ্যোক্তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাঁশগুলি কেটে রোদে শুকিয়ে নেওয়ার পর শুরু হয়েছে বেতের সঙ্গে সূক্ষ্ম বুনন। মণ্ডপের দেওয়াল থেকে সিলিং— সর্বত্রই থাকবে কারুকার্যের ছাপ। বিশেষ আকর্ষণ হবে আলো-ছায়ার খেলা। বাঁশ ও বেতের জালের ফাঁক দিয়ে আলো প্রবেশ করে মণ্ডপের ভিতরে তৈরি করবে বিচিত্র নকশা। প্রাকৃতিক উপকরণের এই স্বাভাবিক গঠনই আলোর সঙ্গে মিশে তৈরি করবে এক মায়াবী আবহ। রাজপ্রাসাদের আভিজাত্যের মধ্যেও তাই থাকবে গ্রামীণ জীবনের পরিচিত ছোঁয়া। কলকাতার শিল্পী অরূপ মজুমদারের পরিকল্পনায় তৈরি হচ্ছে মণ্ডপ। এর উচ্চতা প্রায় ৪০ ফুট। প্রতিমার উচ্চতা ১২ ফুট এবং চওড়ায় ১৬ ফুট। পুজোর অন্যতম কর্মকর্তা অজয় ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের পুজো ঐতিহ্যমণ্ডিত। প্রতিবারই আমাদের থিম মানুষকে অন্যরকম বার্তা দেয়। সেই ধারা এবারও অব্যহত থাকছে। এবার পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। সে জন্যই বাঁশ ও বেত প্রধান উপকরণ। মণ্ডপ কিংবা প্রতিমা তৈরিতে পরিবেশদূষণকারী কোনো সামগ্রী ব্যবহার হচ্ছে না। আলোর কারসাজি মণ্ডপকে অন্যমাত্রা দেবে। মূর্তি হচ্ছে থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই। শুধু রাজপ্রাসাদের আদল তৈরি করা নয়, যে উপকরণ একসময় গ্রামীণ জীবনের
প্রয়োজন মিটিয়েছে সেটিকে আধুনিক শিল্পের মাধ্যমে নতুন মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।