


সুকান্ত বসু, কলকাতা: ১৩২ বছর আগে শোভাবাজার হাটখোলার বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের বাড়ির উঠোনের মাটির নীচে থেকে মিলেছিল বিশাল মাপের একটি কালো পাথর। সেই কালোপাথর থেকে ক্রমাগত ঘাম গড়াচ্ছিল। পরিবারের বিশ্বাস, ওই কালো পাথরের মধ্যেই ছিলেন স্বয়ং মা কালী। মাটির নীচে শ্বাস‑প্রশ্বাস নিতে তাঁর অসুবিধা হচ্ছিল। উপরে তোলার পর তাই তা থেকে ঘাম গড়াচ্ছিল। আসলে ওই ঘাম হল মায়ের চোখের জল। সেই বিশ্বাস থেকেই পরিবারের তৎকালীন গৃহকর্তা বিহারীলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সেই কালো পাথরকে পরম যত্নে নিয়ে গিয়ে বাড়ির মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেদিন থেকেই ওই মন্দিরে শুরু হয় নিত্য কালীবন্দনা। আজও সেই কালো পাথরকে শ্যামাপুজোর রাতে মাতৃজ্ঞানে পুজো করা হয়।
পরবর্তীকালে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের মন্দির উঠে আসে শ্যামপুকুর অঞ্চলে। সেই মন্দিরেই রাখা হয় ওই কালো পাথরকে। তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি পাথরের কালীমূর্তি। কালীপুজোর রাতে আগে ওই কালোপাথরকে পুজো‑অর্চনা করার পর শুরু হয় পাথরের কালীমূর্তির পুজো। এই মন্দিরের কুলদেবতা হলেন ‘নারায়ণ শিলা’। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার মনে করে, ওই নারায়ণ শিলা হলেন এই বাড়ির ‘রক্ষাকর্তা’।
এই মন্দিরে প্রতি অমাবস্যায় নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো হলেও কালীপুজোর রাতে মাকে নিবেদন করা হয় নানা ধরনের ভোগ। সেই তালিকায় থাকে রুই, কাতলা, পাবদা সহ একাধিক মাছ। এছাড়াও মাকে দেওয়া হয় সাদা ভাত, একাধিক সবজি ভাজা, আলুর দম, ফুলকপির তরকারি, ধোঁকা, চাটনি, পায়েস। সঙ্গে খিলি পান। থাকে ১৫ ধরনের মিষ্টি ও ফল। মাকে দেওয়া হয় খই, নাড়ু, মুড়কি, চিঁড়ে। এই পরিবারের সদস্য সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আগে একটা সময় পুজোয় ছাগ বলি দেওয়া হত। এখন বলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পরিবর্তে চালকুমড়ো ও বিভিন্ন ফল মায়ের সামনে নিবেদন করা হয়। এই মন্দিরে বিশাল মাপের কালো পাথরটি দেখতে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন। তবে ওই পাথরের গায়ে প্রতিদিন সিঁদুর দেওয়ার কারণে কালো রং কার্যত ঢাকা পড়ে গিয়েছে। কালীপুজোর রাতে ওই মন্দিরে বহু মানুষের সমাগম হয়।
পুজোর রাতে মাকে একাধিক স্থানের জল দিয়ে স্নান করানোর পর পরানো হয় বেনারসী শাড়ি। স্নানের জলে মেশানো থাকে নানা সুগন্ধী। পুজোর সময় প্রথা মেনে মায়ের চরণে নিবেদন করা হয় পদ্ম। মায়ের সিংহাসন সাজানো হয় নানা ফুল ও লতাপাতায়। মন্দির সেজে ওঠে আলোর মালায়। উত্তর কলকাতার এই ‘পাথর’ কালীর পুজোকে ঘিরে মানুষের মধ্যে রয়েছে বাড়তি উন্মাদনা। নিজস্ব চিত্র