


সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: ছিলেন চিকিৎসকের সহকারী। ক’বছরের মধ্যেই তিনিই হয়ে গেলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ভ্রূণ প্রতিস্থাপনকারী ‘আইভিএফ’-এর কর্ণধার তথা ডিগ্রিধারী চিকিৎসক। এ যেন পি সি সরকারের রুমাল থেকে বিড়াল হয়ে যাওয়ার ম্যাজিক!
একদা বর্ধমানের দু’টি নার্সিংহোমে নিজেকে ডাক্তার বলে দাবি করে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু কাজকর্মে তাঁর উপর সন্দেহ বাড়ে। বিপদ আঁচ করে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যান হুগলির আরামবাগে। সেখানে ওই ‘চিকিৎসক’-এর এখন রমরমা কারবার। ভ্রূণ প্রতিস্থাপন পিছু দেড় থেকে দু’লক্ষ টাকা প্যাকেজ। যা দেখে পাশ করা প্রকৃত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘আমাদের চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনার আর মূল্য কোথায়? জীবনে করলামই বা কি?’ কোন যাদু বলে ওই ধুরন্ধর ব্যক্তিটি ‘ইনফার্টিলিটি অ্যান্ড ইন এমব্রায়োলজিস্ট অর্থাৎ ভ্রূণতত্ত্ববিদ হয়ে উঠলেন, তা ভেবেই শিউরে উঠছেন তাঁরা। বিষয়টি জানতে পেরে আর সময় নষ্ট করেননি বিজেপি নেতা মৃত্যুঞ্জয় চন্দ্র। তিনি স্বাস্থ্যদপ্তরে ওই ব্যক্তির ‘চিকিৎসক’ হয়ে ওঠার রহস্য উদঘটানে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
রবিবার তিনি বলেন, ‘ওই ব্যক্তি নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে আইভিএফ করছেন। এক সময় তিনি বর্ধমানের একটি নার্সিংহোমে এক চিকিৎসকের সঙ্গে আসতেন। তারপর কীভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হয়ে উঠলেন, বুঝতে পারছি না। গোটা ঘটনা তদন্তের জন্য স্বাস্থ্যদপ্তরে অভিযোগ জানানো হয়েছে। আশাকরি, তদন্ত হলে ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়বে। ওর সহযোগীদেরও দুর্গতি রয়েছে।’
একাধিক সূত্রে মৃত্যুঞ্জয়বাবু জানতে পেরেছেন, বিভিন্ন জেলায় ওই ‘চিকিৎসক’-এর এজেন্ট রয়েছে। যে সকল মহিলার গর্ভধারণে সমস্যা রয়েছে তাঁদের বুঝিয়ে-সুজিয়ে আনা হয় আরামবাগের ওই আইভিএফ সেন্টারে। মোটা টাকার প্যাকেজে অপারেশন করেন তিনি। এছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে বেশকিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তথ্য সহকারে স্বাস্থ্যদপ্তরে জানিয়েছেন মৃত্যুঞ্জয়বাবু। বর্ধমানের এক চিকিৎসক বলছিলেন, ‘আইভিএফ হল চিকিৎসা বিজ্ঞানের সেরা আশীর্বাদ। এটা করার অধিকার সবার নেই। প্রথমে এমবিবিএস পাশ করতে হয়। তারপর বিশেষঞ্জ চিকিৎসক হতে গেলে পৃথক পরীক্ষা দিয়ে র্যাঙ্ক করতে হয়। এখানেও শেষ নয়। রিপ্রোডাকটিভ মেডিসিনের ওপর পড়াশোনা করতে হয়। চাইলেই পড়াশোনা করা যায় না। রীতিমতো পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেতে হয়। সারা দেশে সিট সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি এতগুলি ধাপ কীভাবে টপকে গেলেন, সেটাই বড় আশ্চর্যের।
স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ভুয়ো ডাক্তার চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে যে সব রেজিস্ট্রেশন নম্বর মেডিকেল কাউন্সিলে জমা হয়েছে, সেগুলি যাচাই করা হচ্ছে। এক আধিকারিক বলছিলেন, অনেকেই ডাক্তারি পাশ না করেও বড় বড় ডিগ্রি লিখে বিভিন্ন জেলায় প্র্যাকটিস করেছেন। চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হতেই অনেকেই চম্পট দিয়েছেন। কিন্তু, এখনও পর্যন্ত ভুয়ো ডাক্তারদের ধরপাকড় কেন শুরু হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আগামীদিনে স্বাস্থ্য পরিষেবা ঘোরতর সঙ্কটের মুখে পড়বে বলে মত অনেকেরই। মৃত্যুঞ্জয়বাবুও দাবি তুলেছেন—‘আইভিএফের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কেউ ছেলেখেলা করলে তাঁর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক সাজার ব্যবস্থা করতে হবে স্বাস্থ্যদপ্তরকে। আরামবাগের ওই স্বঘোষিত চিকিৎসক বেআইনি পথে ব্যবসা ফেঁদে রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠেছেন। বিভিন্ন জায়গায় তাঁর নামে বেনামে প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে।’